• ঢাকা
  • শুক্রবার:২০২৪:মে || ০৩:৪৪:৫২
প্রকাশের সময় :
এপ্রিল ১৯, ২০২৩,
৩:৪৬ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট :
এপ্রিল ১৯, ২০২৩,
৩:৪৬ অপরাহ্ন

৫৯১ বার দেখা হয়েছে ।

শিকড়ের টানে বাড়ি ফেরা

শিকড়ের টানে বাড়ি ফেরা

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুটি ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। মুসলিম উম্মার জন্য রমজান মাস মহামূল্যবান। ঈদুল ফিতর দুয়ারে কড়া নাড়ছে। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর হাজির হয় ঈদুল ফিতর। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ কাটাতে নিজ কর্মস্থল থেকে মানুষ ছুটে যাবে আপন গৃহে। মানুষের ঈদযাত্রায় ভোগান্তি স্বীকার করেই ছুটছে মানুষ। যেখানে আছে বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্তীয়স্বজন, আছে স্মৃতিবহ শৈশব-কৈশোরের বিভিন্ন এলাকা। পরিবার-পরিজন নিয়ে সেসব জায়গা ঘুরে দেখার আনন্দ ও স্মৃতি জাগানিয়া হয়ে ওঠে মানুষের ভেতরের আকুলি-বিকুলি। আছে পাড়া-প্রতিবেশী। হাটে-মাঠে বাটে অজস্র মানুষ-ঈদেও ছুটির সুযোগে তাদের সঙ্গে চলবে দেখা-সাক্ষাৎ অতীতের স্মৃতিচারণ। সরকারি অফিস-আদালতে শুরু হয়েছে ঈদের ছুটি। মঙ্গলবার ছিল শেষ কর্মদিবস। যদিও তার আগে থেকেই শুরু হয়েছে ঈদযাত্রা। রাজধানীর বাস, লঞ্চ ও রেলস্টেশনগুলোয় দুপুর পর্যন্ত যাত্রীচাপ ছিল না বললেই চলে। তবে গত সোমবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব টার্মিনালে যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে।
ঈদের এই দিনটি শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা ও ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাইকে এককাতারে শামিল করার চেতনায় উজ্জীবিত করে। ঈদকে কেন্দ্র করে পোশাক-আশাকসহ অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়ে সর্বত্র বাড়ছে ব্যস্ততার পরিধি। অনেকেই শহর থেকে কেনাকাটা করে গ্রামের বাড়ি যেতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে। শ্রেণি, ধর্ম-বর্ণ, ধনী, গরিব নির্বিশেষে সব মানুষ ভাগাভাগি করে নেয় ঈদের আনন্দ। ঈদের আনন্দ স্বজনদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য বিপুলসংখ্যক কর্মজীবী মানুষ ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহর থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যান। কিন্তু নিরাপদে বাড়ি ফেরার প্রত্যাশা থাকে সবার। এ সময় আন্তঃজেলা বাস কোম্পানিগুলো তাদের ট্রিপের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। ঘরমুখো মানুষের ভিড় সামাল দিতে চালু হয় বিশেষ সার্ভিস। এ সময় বিআরটিসিও বিশেষ সার্ভিস চালু করে। কিন্তু ঘরমুখো মানুষের চাপ সামাল দেয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না। বিভিন্ন ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লঞ্চ রং করে নতুনের মতো করে তোলা হচ্ছে। যার ফলে ক্রমেই বাড়ছে দুর্ঘটনা। যানবাহন জুড়েই এখন রয়েছে বাড়ি ফেরার উপচেপড়া ভিড়! তার ওপর সহ্য করতে হয় যানজটের তীব্র যন্ত্রণা।
ঢাকার ভেতরেই যানজটে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট ছিল। তীব্র গরম ও যানজটে যেন হাঁসফাঁস অবস্থা তাদের। এমন অবস্থার মধ্যেও নাড়ির টানে গ্রামে ছুটে যাচ্ছেন নগরবাসী। রাজধানীর কমলাপুর থেকে বেশির ভাগ ট্রেন সময়মতো ছেড়ে গেছে। তবে ছয়টি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ২০ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছে। অপরদিকে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ৫৫টি লঞ্চ বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে গেছে।
পরিবহণসংশ্লিষ্টরা জানান, সামনে এসএসসি পরীক্ষা এবং তীব্র গরমসহ নানা কারণে এবার ঈদযাত্রায় যাত্রী অন্যান্য বছরের চেয়ে কম হবে বলে মনে হচ্ছে। এছাড়া সরকারি ছুটি দীর্ঘ হওয়ায় একই সঙ্গে যাত্রীচাপ পড়ার আশঙ্কা কম। তবে বিষয়টি অনেক গার্মেন্ট ছুটির ওপর নির্ভর করছে। একই দিন অনেক গার্মেন্ট ছুটি হলে পরিবহণের ওপর যাত্রীচাপ বেড়ে যাবে। তখন শৃঙ্খলা ধরে রাখাও কঠিন হবে।
ঈদ উপলক্ষে বিশেষ ট্রেন ও বাড়তি বগি সংযোজন করার পরও অনেককে ট্রেনের ছাদে চড়ে বাড়ি ফিরতে দেখা যায়। এ ছাড়া অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হলেই বেড়ে যায় কালোবাজারিদের তৎপরতা। যার ফলে সাধারণ যাত্রীদের গুনতে হয় তিন-চারগুণ বেশি ভাড়া।
ঈদে যাত্রীদের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে এবার বাংলাদেশ রেলওয়ে বিকল্প পন্থা মাথায় নিয়েছে। শতভাগ টিকিট অনলাইনে বিক্রি করছে। এটা আসলেই একটি মহৎ উদ্যোগ। কাউন্টারে যাত্রীদের ভোগান্তি দূর করতে আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এবার ট্রেনের শতভাগ টিকিট অনলাইনে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। গত ৭ এপ্রিল থেকে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট অনলাইনে বিক্রি শুরু হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে ১০ জোড়া বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করেছে রেলওয়ে।
ঈদযাত্রায় শতভাগ অনলাইন টিকিট বিক্রির প্রক্রিয়াটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আগামী ১ মে থেকে ট্রেনের শতভাগ টিকিট অনলাইনে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। কাউন্টার থেকে শুধু স্ট্যান্ডিং বা আসনবিহীন টিকিট দেওয়া হবে যাত্রীদের। এত কষ্টের পরও মানুষ বাড়ি ফেরে, এটাই তার আনন্দ। এই আনন্দকে আরো পূর্ণতা দিতে এবং দুর্ভোগ কমানোর জন্য টিকিট কেনাবেচা ও যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত করতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লঞ্চ সড়ক ও নৌ-পথ থেকে সরানো জরুরি। আবার ঈদের সময় দেখা যায়, আঞ্চলিক রুটের অনেক বাস চলে আসে মহাসড়কে। এসব বাস মহাসড়কে যানজটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবছর দেখা যায়, ঈদের সময় বিভিন্ন চক্র যেমনÑ ছিনতাইকারী, মলম পার্টি, গামছা পার্টির আবির্ভাব হয়। বিশেষ করে মলম পার্টির প্রাদুর্ভাব ঈদের সময় বেশি দেখা যায়। তারা খাবারের মধ্যে নেশা জাতীয় বা চেতনানাশক দ্রব্য মিশিয়ে মানুষকে অজ্ঞান করে অর্থ, ফোন এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয়াই তাদের কাজ। যাতায়াতের সমস্ত মাধ্যমে যারপরনাই ভিড়। বিশেষ বা অতিরিক্ত বাস -ট্রেনও এই মানুষের স্রোত সামলে উঠতে হিমশিম খায়। উপরন্তু বেশি ভাড়ার বিড়ম্বনা। উৎসবকে কেন্দ্র করে বেড়ে যায় রোড এক্সিডেন্টের মাত্রা, বেড়ে যায় ছিনতাই, চুরি, চাঁদাবাজির মতো অনেক সামাজিক অপকর্ম।
বর্তমানে ঈদে দেখতে পাওয়া যায় সংশ্লিষ্ট সবার ব্যাপক এবং আরো সক্রিয় অংশগ্রহণ। জনসংখ্যার বৃদ্ধি এর অন্যতম কারণ। এছাড়াও পুঁজিবাদী সমাজও এই পরিবর্তনের প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। নয়া অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার ফলে সমাজে বেড়েছে টাকার সরবরাহ। এই অর্থ সাম্প্রতিককালের ঈদের সময় এদের নতুন এবং দামি জামাকাপড়, গয়না, জুতা, অন্যান্য উপহারসামগ্রী যথেষ্ট কেনার সামর্থ্য এনে দিয়েছে। এসব নৈতিকতাবিরোধী আচরণ এই সময়ের উৎসবগুলোকে বিকারগ্রস্ত করে এবং ঈদকে সঞ্জীবিত করে চলছে মূল ধারা থেকে ভিন্ন পথে। উৎসব উপলক্ষে সকল পণ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধিতে এক শ্রেণির মানুষ ব্যাপক অসুবিধার শিকার হয়। তবুও ঈদের আমেজ বয়ে চলে সর্বত্র।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকে বাস বা ট্রেনের ছাদে যাতায়াত করেন। তাই যাত্রাপথে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবেন যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। পরিশেষে, ঈদে সবার জীবন হয়ে উঠুক আনন্দময় ও নিরাপদ, এটাই প্রত্যাশা। সবাইকে ঈদ মোবারক!!


লেখক: সংবাদিক ও কলামিস্ট