• ঢাকা
  • শুক্রবার:২০২৪:এপ্রিল || ১৩:০৭:৩৫
প্রকাশের সময় :
জুলাই ১২, ২০২৩,
৪:১২ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট :
জুলাই ১২, ২০২৩,
৪:১২ অপরাহ্ন

৪৮১ বার দেখা হয়েছে ।

ভোক্তা অধিকার আইনের প্রয়োগ জরুরি

ভোক্তা অধিকার আইনের প্রয়োগ জরুরি

দেশের প্রতিটি নাগরিকই ভোক্তা। এমনকি যে শিশুটি মায়ের গর্ভে আছে, সে শিশুটিও একজন সম্মানিত ভোক্তা। ভোক্তা কে তা জানতে হবে। ভোক্তা হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি টাকার বিনিময়ে কোনো জিনিস ক্রয় করেন। কোনো ভোক্তা কোনো সেবা বা কোনো পণ্য বা জিনিস ক্রয় করার সময় প্রতারিত হলে তার অধিকার লঙ্ঘিত হয়। সুতরাং ভোক্তা হিসেবে যেসব অধিকার পাওয়া যায়, সে অধিকারগুলো হলো ভোক্তা অধিকার। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন ব্যবসায়ী নিজেও ভোক্তা, কারণ তিনি নিজেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সেবা ও ক্রয় করে থাকেন।
ধরুন, কোনো হোটেল বা রেস্তোরাঁয় খেতে বসেছেন। খাওয়ার সময় আপনার কাছে মনে হলো খাবারটি বাসি বা পচা কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ। আপনি তাৎক্ষণিক হোটেল বা রেস্তোরাঁর কর্তৃপক্ষকে জানালেন বিষয়টি। কিন্তু তারা পাত্তা দিলেন না অভিযোগটির। উল্টো দাম দিয়ে কেটে পড়ার জন্য বলল। কিন্তু এত দাম দিয়ে খাবার খেতে এলেন আর এমনি এমনি ছেড়ে দেবেন? আপনি হয়তো জানেন না যে, এ ধরনের অভিযোগের প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থাও আছে।
শুধু পচা, বাসি বা ভেজাল খাবারের জন্য নয়, বরং ভোক্তা হিসেবে আপনি যেকোনো ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হলে বা ঠকে গেলে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। প্রতিকারের পাশাপাশি আপনি পাবেন ক্ষতিপূরণও। আমাদের দেশে কোনো কারণ ছাড়াই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিয়ে ভোক্তার কাছ থেকে অধিক মুনাফা আদায় করে। যেটা ভোক্তার অধিকার আইন বহির্ভূত। তাছাড়া ফরমালিন, কার্বাইড, দেয়ালের রং, শিল্পে ব্যবহƒত রং ও লবণ, বিষাক্ত কেমিক্যাল, পোড়া মবিল, টেস্টিং সল্ট ইত্যাদির মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ভোগ্যপণ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে আমাদের হার্ট, কিডনি, লিভার, ফুসফুসসহ বিভিন্ন অঙ্গের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। ডায়াবেটিস এখন অতি সাধারণ রোগে পরিণত হয়েছে। জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও প্যাথলজিক্যাল টেস্টেও ভেজালের ছড়াছড়ি। সাধারণ মানুষ অনেকটা নিয়তি ভেবে সবকিছু মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। বিকল্প না থাকায় ভয়ংকর ক্ষতিকর জেনেও হাসিমুখে শিশুর হাতে জুস বা চিপসের প্যাকেট তুলে দিচ্ছে। এ অবস্থায় অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। ফলে ভোক্তা অধিকার আইনের প্রয়োগ জরুরি।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ অনুযায়ী, বিক্রেতার পণ্যের মোড়ক ব্যবহার না করা, মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে পণ্য বেশি দামে বিক্রি করা, সেবার তালিকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শন না করা, অধিক মূল্যে পণ্য বিক্রয় করা, পণ্য মজুত করা, ভেজাল পণ্য বিক্রয়, খাদ্যপণ্যে নিষিদ্ধ দ্রব্যের মিশ্রণ, অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা প্রতারণা, প্রতিশ্র“ত পণ্য সরবরাহ না করা, ওজনে ও পরিমাপে কারচুপি, দৈর্ঘ্য পরিমাপের ক্ষেত্রে গজ ফিতায় কারচুপি, নকল পণ্য প্রস্তুত, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রয়, অবহেলা প্রভৃতি কারণে আমরা আইনের আশ্রয় নিতে পারি। কিন্তু আমরা তা করছি না। কারণ আমরা ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে জানি না। ২০০৯ সালে প্রণীত ভোক্তা অধিকার আইনে মোট ৮২টি ধারা রয়েছে। কিন্তু আমরা সাধারণ জনগণ সেই ধারাগুলো সম্পর্কে জানি না। বর্তমানে অনলাইনে কেনাকাটা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কিন্তু ওয়েবসাইটে পণ্যের যে মান উল্লেখ থাকে, মূল্য পরিশোধের পর পণ্য হাতে পেয়ে দেখা যায়, বর্ণিত গুণাগুণ সেই পণ্যের মধ্যে নেই।
আপনি ওই বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ওপর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভোক্তা অধিদপ্তর তদন্ত সাপেক্ষে মামলা করতে পারবে। প্রথম তদন্তেও যদি প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে অভিযোগকারী এবং যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উভয়কে শুনানিতে ডাকা হবে। শুনানির পরিপ্রেক্ষিতে এবং অভিযোগের তদন্ত শেষে যদি অভিযোগের প্রমাণ মেলে, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জরিমানা প্রদানের আদেশ দেবে অধিদপ্তর। এ জরিমানা হিসেবে যে টাকা আদায় করা হবে, তার ২৫ শতাংশ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাকে দেওয়া হবে। এ ছাড়া জরিমানা ছাড়াও ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল, ব্যবসায়িক কার্যক্রম সাময়িক বা স্থায়ীভাবে স্থগিতও করতে পারে অধিদপ্তর। যেসব জেলায় অধিদপ্তরের শাখা নেই, সেসব জেলায় এই আইনে মহাপরিচালককে যে ক্ষমতা দেওয়া আছে, তা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর ন্যস্ত থাকবে।
একজন নাগরিকের বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন। এর কিছু প্রদান করে থাকে পরিবার, কিছু করে রাষ্ট্র। তবে অন্যান্য অধিকার থেকে ভোক্তা অধিকার কিছুটা ভিন্ন। যিনি উৎপাদিত পণ্য ও সেবা চূড়ান্ত ভোগের জন্য ক্রয় করেন, অর্থনীতির ভাষায় তাকে ভোক্তা বলে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যিনি কোনো পণ্য ক্রয় করেন কেবল নিজে ভোগ করার জন্য, তিনিই ভোক্তা। একজন ব্যক্তি যখন কোনো পণ্য ক্রয় করেন, তখন তার জানার অধিকার রয়েছে। পণ্যটি কবে উৎপাদিত হয়েছে, কোথায় উৎপাদিত হয়েছে এবং এর কাঁচামাল কী কী, মূল্য কত ইত্যাদি। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে একজন বিক্রেতা বাধ্য। যদি কোনো বিক্রেতা এসব প্রশ্নের উত্তর না দেন বা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তখন আইন অনুযায়ী তাতে ভোক্তা অধিকার ক্ষুণœ হয়।
মানহীন, ভেজাল ও কম পুষ্টিমান সম্পন্ন খাবার গ্রহণের ফলে আমাদের শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। অসংখ্য রোগের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হচ্ছে একেকটি স্থূলকায় শরীর। বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। খাদ্যে ভেজাল মেশানো ভয়াবহ অপরাধ। কারণ খাদ্যে ভেজালের কারণে একজন মানুষকে ধুঁকে ধুঁকে পুরোজীবন যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে। এছাড়া প্রতি বছর চিকিৎসা খাতে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশ চলে যাচ্ছে। পরিবার, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছে না।
পণ্য ক্রয়ে প্রতারণার হাত থেকে ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে বহুল প্রতীক্ষিত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করেছে। এ আইনের ফলে কোনো ভোক্তা পণ্য ক্রয়ে পণ্যের ওজন, পরিমাণ, উপাদান, মূল্যসহ কোনো বিষয়ে প্রতারিত হলে তার প্রতিকার পেয়ে থাকেন। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এই গুরুত্বপূর্ণ আইনটি সম্পর্কে অবগত নয়। এমনকি শিক্ষিত সমাজের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তির মধ্যেও এই আইন সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা নেই। সম্প্রতি কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি কাচামরিচের দাম এক লাফে ৪০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করে। এই অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যা ভোক্তা অধিকার আইন বহির্ভূত। কাঁচামরিচের দাম নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়তই এ ধরনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তুলে ধরলেও এদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে। তারপরও লাগাম টানার উদ্যোগগুলো বেশ দুর্বল। তাহলে আমরা কি তাহলে জেগে জেগে ঘুমাচ্ছি?
সাধারণ মানুষের অধিকারগুলো হলোÑ মৌলিক চাহিদা পূরণের অধিকার, তথ্য পাওয়ার অধিকার, নিরাপদ পণ্য বা সেবা পাওয়ার অধিকার, পছন্দের অধিকার, জানার অধিকার, অভিযোগ করা ও প্রতিকার পাওয়ার অধিকার, ভোক্তা অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা লাভের অধিকার, সুস্থ পরিবেশের অধিকার। তাই ভোক্তাকে এই আইন সম্পর্কে জানতে হবে এবং নির্ধারিত পন্থায় অভিযোগ দায়ের করতে হবে। তাহলেই অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাÍ্য কমবে এবং ভোক্তাদের প্রতারিত হওয়ার সংখ্যাও কমে আসবে।
পণ্য কিনে প্রতারিত হলে অভিযোগ দায়ের করার পদ্ধতি খুবই সহজ। বর্তমানে প্রত্যেকের হাতে হাতে স্মার্টফোন। গুগোল পেস্টোরে সংরক্ষিত ‘ভোক্তা অধিকার ও অভিযোগ’ অ্যাপসের মাধ্যমে খুব সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে অভিযোগ দায়ের করা যায়।
ভোক্তা, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়েও বিশেষভাবে সচেতন থাকতে হবে। এছাড়া আর্থিকভাবে কম সক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিটি ব্যক্তি যাতে তার প্রাপ্য অধিকার পেতে পারেন এটা নিশ্চিত করতেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এর ধারাবাহিকতাও রক্ষা করতে হবে। ভোক্তা অধিকার আইন সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। সবাই সচেতন হলেই আইনটির সঠিক বাস্তবায়ন হবে। আমাদের একটুখানি সচেতনতাই পারে নিরাপদ খাদ্য ও ভেজালমুক্ত পণ্যের বাংলাদেশ গড়তে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট