• ঢাকা
  • মঙ্গলবার:২০২৪:ফেব্রুয়ারী || ২০:৫৪:৫৫
প্রকাশের সময় :
ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২৩,
৪:৫৯ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট :
ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২৩,
৪:৫৯ অপরাহ্ন

৪০৩ বার দেখা হয়েছে ।

ভাষা সংগ্রাম ও ভাষার গান

ভাষা সংগ্রাম ও ভাষার গান

পৃথিবীর সকল দেশেই জাতীয় জীবনে দু-একটি দিন আসে যা স্বমহিমায় উজ্জ্বল। আমাদের জাতীয় জীবনে এমন স্মৃতি বিজড়িত মহিমা-উজ্জ্বল একটি দিন একুশে ফেব্র“য়ারি। সারা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে এ দিনটি স্মরণীয়। একুশে ফেব্র“য়ারির ইতিহাস একদিকে আনন্দের, অন্যদিকে বেদনার। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিকে দমিয়ে রাখতে প্রথমেই হাত দিয়েছিলো ভাষার উপরে। মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল ১৯৪৮ সালে। বাংলার মানুষ সে অন্যায় মেনে নেয়নি। বাংলার দামাল ছেলেরা তুমুল বিরোধিতা করে রাজপথে নেমে আসে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে বাংলার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে। ঐদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে বেরিয়ে এলে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। পাকিস্তানি সরকার আন্দোলন দমানোর জন্য শুরু করে জুলুম, গ্রেফতার, নির্যাতন। এতেও বাংলার দামাল ছেলেদের দমাতে না পেরে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি তাদের মিছিলে নির্মমভাবে গুলিবর্ষণ করা হয়। এতে প্রাণ হারান রফিক, শফিকুর, সালাম, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা আরো অনেকে। তাদের রক্তে ঢাকার রাজপথ রক্তেরঞ্জিত হয়ে যায়। এভাবে বহু ত্যাগের বিনিময়ে বাংলা পায় রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা। তাই এ দিনটি শহীদ দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিবছর একুশে ফেব্র“য়ারি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালন করা হয়। বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া ইতিহাসে বিরল ঘটনা। বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রেই এই রকম ঘটনা ঘটেনি। তাইতো আজ আমাদের ভাইদের আত্তত্যাগ বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসন পেয়েছে। তাই সমগ্র বাঙালির চেতনায় চিরস্মরণীয় তথা সমগ্র বিশ্বে বরণীয় হয়ে থাকে ভাষা শহীদদের নাম। তাদের ঋণ আমরা কোনো দিনেই ভুলব না।
ভাষা আন্দোলনে কতজন শহীদ হয়েছিলেন সে বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি। সেদিন এবং পরদিন পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং শফিকুর ছাড়াও আরো অনেকে শহীদ হয়েছিলেন বলে ভাষা আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন বইয়ে উঠে এসেছে। তবে এই ঘটনার দুই বছর পর, ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান সংসদ বাংলাকে একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকার করে প্রস্তাব গ্রহণ করে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি কার্যকর হতে লেগেছিল আরো দুই বছর। মাতৃভাষা নিয়ে এই আন্দোলনেই বীজ বপন হয়েছিল পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। একুশে ফেব্র“য়ারির এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন আরো বেগবান হয়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৭ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয় ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্র“য়ারি।
রাষ্ট্রভাষার জন্য আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনকে ধারণ করে আছে একুশের গান। একুশে ফেব্র“য়ারি যে গানের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় ভাষা শহীদদের। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্র“য়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’। এ গানটি লিখেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। প্রয়াত গণসঙ্গীত শিল্পী আবদুল লতিফ প্রভাতফেরির গানটিতে প্রথম সুরারোপ করেন। পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী গানটি লিখেছিলেন। তার এই অমর কবিতার বাণী নিয়ে ১৯৫৩ সালে গানটি সুর করে প্রথমবার ঢাকা কলেজের ছাত্রদের এক অনুষ্ঠানে পরিবেশন করেন আবদুল লতিফ। এমন একটি গান করার কারণে কর্তৃপক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ১১ ছাত্রকে বহিষ্কার করে। আলতাফ মাহমুদ গানটিতে ১৯৫৪ সালে নতুন সুর দেন। তার দেওয়া সুরেই এখন গানটি জনপ্রিয় হয়ে আছে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের জন্য ভাষা শহীদদের জন্য অনেক গান রচিত হয়েছে। একুশের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা ও ঘটনা নিয়েও হয়েছে নানা গান। এসব গানের গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীকেও তাই ভাষা শহীদদের মতো জানাই এক গুচ্ছ শুভেচ্ছা ও বিনম্র শ্রদ্ধা। ভাষা আন্দোলনের গানের জন্য সুরকার হিসেবে আবদুল লতিফ ছিলেন মূল স্তম্ভ। আবদুল লতিফ বিভিন্ন জনপ্রিয় গানের সুর স্রষ্টা। তারপরও গানের ক্ষেত্রে তার অমর সৃষ্টি হচ্ছে ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়/ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে পায়’ গানটি। এ গানটি অন্য সব গানের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় লাভ করে। অসাধারণ এই গানের কথা ও সুর। প্রতিবছর একুশে ফেব্র“য়ারিতে শিল্পীদের কণ্ঠে শোনা যায় এ গানটি। মাইকে ভেসে বেড়ায় গানের সুর।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত সংস্থা ইউনেস্কোর অধিবেশনে ২১ ফেব্র“য়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তাই ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোয় (বর্তমানে এই সংখ্যা ১৯৩) ২১ ফেব্র“য়ারি পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। ইউনেস্কোর এ সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের একটি বিশিষ্ট অর্জন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের উজ্জ্বল অধ্যায়টি বিশ্ব ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ে পরিণত হয়।
আজকের বিশ্বায়নের প্রবল স্রোতধারায় শুধু জাতি-রাষ্ট্র, জাতীয় স্বাতন্ত্র্য, জাতীয়তাবোধ যে নীরবে-নিঃশব্দে ক্ষয়ে যাচ্ছে তাই নয়, জাতীয় ভাবধারার মাধ্যমে যে ভাষা তাও ক্রমে ক্রমে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে উঠছে। বিশ্বায়নের একালে বহুজাতিক করপোরেশনের স্বার্থে বিশ্বব্যাপী এককেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিজয় নিশ্চিত করতে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। যেহেতু সংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম হলো ভাষা, তাই ভাষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৪০ কোটি লোক ইংরেজিকে ব্যবহার করছে তাদের প্রথম ভাষা হিসেবে। আরো ২৫ কোটি মানুষের কাছে ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা। প্রায় ২০০ কোটি মানুষ এ মুহূর্তে ইংরেজি শিক্ষায় গভীরভাবে মনোযোগী। ২০৫০ সালে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক লোকের ভাষা হবে ইংরেজি। বিশ্বায়নের এ যুগে বিশ্বময় যোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে ইংরেজি। ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে ইংরেজিতে। কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ভাষা হিসেবে ব্যবহƒত হচ্ছে ইংরেজি। তাই আজ ইংরেজি শুধু একটি ভাষা নয়, এটি এখন এক নব্য সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। মানুষ তারই সঙ্গে শত্র“তা করে, যা তার স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। রাষ্ট্রের শক্তিমান প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- ব্যাংক, বীমাপ্রতিষ্ঠান, করপোরেশন, বিচারালয়, সচিবালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ইনস্টিটিউট, বাণিজ্যসংস্থা, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কার্যকলাপে বাংলা ভাষার পরিবর্তে এখনো ইংরেজি প্রাধান্য দিচ্ছে। এমনকি ব্যবসা-বাণিজ্য, বড় বড় দোকান, শপিংমল, কল-কারখানাতেও বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা হচ্ছে। কেন আজও এসব প্রতিষ্ঠানের নাম পুরোপুরি বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে না। ইংরেজি ভাষার জন্য কি আমরা ভাষা আন্দোলন করেছিলাম। বাংলাদেশে আছে এখন এমন কিছু দল, গোষ্ঠী, শ্রেণি, বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা যাদের স্বার্থের পরিপন্থি। তারা সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়ভাবে বাংলা ভাষার সঙ্গে শত্র“তা করে আসছে। বাঙালির কাছে বাংলা ভাষা এখনো পুরোপুরি শ্রদ্ধেয় ভাষা হয়ে উঠতে পারেনি। আড়াই শতাব্দী আগে তারা শ্রদ্ধা করেছে ফারসি ভাষাকে। গত দু’শ’ বছর ধরে শ্রদ্ধা করে আসছে ইংরেজি ভাষাকে। দুটিই সাম্রাজ্যবাদী রাজকীয় ভাষা, যা বাঙালির কাছে আভিজাত্যের প্রতীক। আমাদের রুগ্ন সমাজব্যবস্থা এমন কিছু মানুষ ও তাদের একটি শ্রেণি সফল হয়েছে, যারা অসুস্থভাবে ইংরেজিমনস্ক। এভাবে আজকের এককেন্দ্রিক বিশ্বে একদিকে যেমন বিশ্বের একক ভাষা হিসেবে ইংরেজির অবস্থান ক্রমে ক্রমে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে। তেমনি হারিয়েছে যাচ্ছে বিভিন্ন রাষ্ট্রের তাদের নিজেদের ভাষা সংস্কৃতি।
সবচেয়ে বড় কথাÑ মাতৃভাষা মায়ের ভাষা, স্বদেশি ভাষা। মাতৃভাষার চেয়ে সহজ অন্য কোনো ভাষা হতে পারে না। ভাষা হলো সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যম। ইতিহাস ঐতিহ্যের বাহন। বাংলা ভাষায় সেরা সাহিত্যকর্ম লেখা হবে, বিকশিত হবে তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। তাই সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট