• ঢাকা
  • শুক্রবার:২০২৪:Jun || ২২:৫৭:১৯
প্রকাশের সময় :
মার্চ ১৭, ২০২৩,
২:১৩ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট :
মার্চ ১৭, ২০২৩,
২:১৩ অপরাহ্ন

৪৮০ বার দেখা হয়েছে ।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালিকে একটি হীন, দুর্বলচিত্ত জাতি হিসেবে পরিচয় করিয়েছে ব্রিটিশরা। আজ এই পরিচয়ের কালিমায় সিক্ত হয়ে বাঙালি শাসিত হয়ে আসছে। শাসনের ভার যথার্থ অর্থে বাঙালি কোনো দিন পায়নি। ইতিহাস পড়ে জানা যায়, গুপ্তযুগের পূর্বে বাঙালির কোনো পরিচয় ছিল না। ইতিহাসে শশাঙ্ক ও গোপাল নামক দুই স্বাধীনচেতা রাজার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। কিন্তু তারা স্বাধীনভাবে দেশ শাসন করেছেন ইতিহাসে এমন প্রমাণ নেই। বাংলাদেশের ইতিহাস নানা জটিলতার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ইংরেজ এসেছে। ইংরেজ ছিল সুচতুর জাতি। ইংরেজ তার শাসনকে টিকিয়ে রাখার জন্য নানান কৌশল অবলম্বন করেছে। জš§ দিয়েছে সাম্প্রদায়িকতার। যে সাম্প্রদায়িকতায় হিন্দু মুসলিমের গলায় এবং মুসলিম হিন্দুর গলায় ছুরি বসিয়েছে। মানুষে মানুষে বিশৃঙ্খলায় মেতেছে। অর্থাৎ বাঙালি নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানত না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তোপে ইংরেজরা দেশ ছাড়লে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ করে দিয়ে যায়। জš§ নেয় পাকিস্তান নামের এক বিষবৃক্ষ চরম ধর্মীয় মনোভাব নিয়ে। পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের শাসনে প্রবৃত্ত হয়। বাঙালিরা হলো পাকিস্তানি। বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি, জীবনবোধÑ সব হবে পাকিস্তানি শাসকদের চাপিয়ে দেয়া ভাষা কেন্দ্রিক। পাকিস্তানের শাসকরা বাংলার ভাষাকে উর্দু ভাষায় রূপান্তর করতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা টিকে থাকতে পারলো না। বাঙালিকে স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে যিনি নেতৃত্ব দিলেন তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৩তম জš§দিন আজ। স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর জš§দিনটি ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবেও পালন করা হয়। বাংলার রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের নিভৃত গ্রাম টুঙ্গীপাড়ায় জš§গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জš§ নেওয়া শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন। বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য তিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথ পেরিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি ও বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তিসগ্রামের অনুপ্রেরণার উৎসও হয়ে ওঠেন।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তারিখে জš§গ্রহণকারী বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব বংশপরম্পরায় ছিলেন শেখ বংশের গোড়াপত্তনকারী শেখ বোরহানউদ্দিনের বংশধর। তার পিতা-মাতা সকলেই ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করাকে পছন্দ করতেন না তিনি। রাষ্ট্রীয়ভাবে সকল মানুষের স্ব-স্ব ধর্মের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বঙ্গবন্ধুর উৎসই ছিল রসূল (স.) এর মদিনা সনদের শিক্ষার অনুকরণে। ঐতিহাসিক মদিনা সনদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘মদিনা ইহুদি-নাসারা, পৌত্তলিক এবং মুসলমান সকলেই নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে।’ ইসলামই প্রথম নিরপেক্ষতার বাণী বিশ্বে প্রচার করেছে, ‘তোমার ধর্ম তোমার জন্য, আমার ধর্ম আমার জন্য এবং ধর্মে কোন জুলুম বা অত্যাচার নেই’। এ কথা পবিত্র কুরআন ছাড়া আর কোনো ধর্মগ্রন্থ প্রচার করেনি। ধর্মকে বঙ্গবন্ধু শ্রদ্ধা করতেন, নিয়মিত নামায আদায় করতেন, রোজাও রাখতেন। এ কারণেই তিনি এদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের গোড়া হতেই ধর্মনিরপেক্ষতা প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম-নিরপক্ষতার স্বীকৃতির মধ্যে তাই এদেশের জনগণের সুদীর্ঘ তিক্ত অভিজ্ঞতা ও বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ প্রত্যয়ের ফলশ্র“তি ঘটেছে তা বাস্তবায়ন করে এ জাতি উন্নত জাতিতে পরিণত হয়েছে।
মুজিবের অস্তিত্ব আর ভালোবাসা না থাকলে বাঙালি জাতি আজ বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারত না। বাঙালি জাতি হতে পারত না। পারত না ইতিহাসের গতিধারা বদলিয়ে দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে। মুজিব বাঙালিকে প্রকৃত বাঙালি হতে শিক্ষা দিয়েছেন। রেসকোর্সের মাঠে ভাষণে বলেছেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মানুষ। আমরা আশা করছি, তার এই আদর্শ প্রতিটি বাঙালি গ্রহণ করেই বাঙালি হিসেবে ‘ভাইয়ের-মায়ের’ øেহকে সম্বল করে আমরা সাম্প্রদায়িকতাহীন জীবন-যাপন করব।
আজ রাজনীতির স্বার্থে অনেকেই জাতির পিতার আদর্শকে ম্লান করতে চায়। আমরা বাঙালি অনেক গ্লানি কাটিয়ে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছি। শেখ মুজিব না হলে আমাদের এই স্বাধীনতা সম্ভব হতো না। তিনিই ছিলেন আমাদের দ্রষ্টা, তিনিই ছিলেন আমাদের আদর্শ, তিনিই ছিলেন আমাদের অনুপ্রেরণা। স্বাধীনতার জন্য দরকার আদর্শ, দরকার ত্যাগ ও তপস্যা। স্বাধীনতা এমন জিনিস নয়, যা কখনো বিনা ত্যাগ ও তপস্যায় অর্জন করা যায়। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি অনেক ত্যাগ ও তপস্যার বিনিময়ে। আমাদের এই ত্যাগ ও তপস্যার নায়ক শেখ মুজিব। বাঙালি আজ এই দুর্জয় বীরের নেতৃত্বে স্বাধীনতা পেয়েছে এবং এই দেশের নামকরণ হয়েছে বাংলাদেশ।
১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার সহধর্মিণী ফজিলাতুন্নেছাকে এক দল সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির বাসভবন আক্রমণ করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এছাড়াও এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছেন ফজিলাতুন্নেছার দশ বছরের ছেলে শেখ রাসেল, তার বাকি দুই ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল এবং রোজি জামাল, ভাই আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, দেবর শেখ নাসের, ভাতিজা শেখ ফজলুল হক মণি এবং তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি। সেসময় বিদেশে থাকার কারণে শুধুমাত্র তার কন্যাদ্বয় শেখ হাসিনা ওয়াজেদ এবং শেখ রেহানা প্রাণে রক্ষা পান।
শেখ মুজিবের সুচিন্তা থেকে আজকের বাঙালিরও শেখার আছে উল্লেখ করে ভারতীয় বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, তাকে ‘বাংলাদেশের জনক’ বা বঙ্গবন্ধু বলাটা নিতান্তই কম বলা। তিনি এর চেয়ে বড় কোনো অভিধা এবং নাম কিনতে চাননি। মানুষ তাকে অন্তর থেকে ভালোবাসতেন।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ বিচারের হাত থেকে খুনিদের রক্ষা করতে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে আইন হিসেবে অনুমোদন করেন। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গন্ধুকে হত্যা করে যারা ভেবেছিল ইতিহাস থেকে তার নাম মুছে দেবেÑতা হয়নি। বাঙালি তাকে ভোলেনি। আজ শোক দিবস পালনে বাঙালির একাগ্রতা তার প্রমাণ। প্রতিবছর ১৫ আগস্ট জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয়। এই দিনে কালো পতাকা উত্তোলন ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এ দিবসের উৎপত্তি।
যে সরকারই দেশ শাসন করুন না কেন, মুজিব যেন থাকেন আমাদের আদর্শে, আমাদের অনুপ্রেরণা ও আমাদের চেতনার প্রতীক মহাপুরুষ হয়ে।
মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসের একক মহান পুরুষ। তিনিই গোটা বাঙালি জাতির আদর্শের নাম। মুজিব বাঙালি জাতির ইতিহাসের নতুন পরিচয়ের নাম।


লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট