• ঢাকা
  • শুক্রবার:২০২৪:এপ্রিল || ১৪:১৪:৩৩
প্রকাশের সময় :
অগাস্ট ১১, ২০২৩,
২:১৩ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট :
অগাস্ট ১১, ২০২৩,
২:১৩ অপরাহ্ন

৩০৫ বার দেখা হয়েছে ।

পর্যবেক্ষক নিয়োগের সীমারেখা কী?

পর্যবেক্ষক নিয়োগের সীমারেখা কী?

জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের দেশের নেতৃত্ব বাছাইয়ের জন্য খুবই গুরুত্ববহ। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হয় আমাদের পছন্দের প্রতিনিধিরা। যারা জাতীয় সংসদে নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করে। পাঁচ বছর পর পর সংঘটিত হওয়া এ নির্বাচন জনগণের কাছে একটি উৎসবের মতো। জনগণ তার পছন্দের প্রার্থীর জন্য বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালায়। নির্বাচনে হার-জিতের মধ্য দিয়ে প্রার্থী নির্বাচন গণতন্ত্রের সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচন সুষ্ঠু হলো কি হলো না এটা দেখতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ হয়। দেশের ছাড়া বিদেশের পর্যবেক্ষকরাও আসেন নির্বাচন মনিটরিং করতে। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ পর্যবেক্ষক হওয়ার শর্তাবলি কী? এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনী নীতিমালায় বলা আছে- বাংলাদেশের কোনো নাগরিক এসএসসি পাস করলেই নির্বাচন পর্যবেক্ষক হতে পারেন। আর বিদেশিদের ব্যাপারে দেশীয় নীতিমালার সঙ্গে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন থাকতে হয়। ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম (ইএমএফ) নামে বাংলাদেশি একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে চার বিদেশির প্রাক নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তারা নির্বাচন কমিশন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠকও করছেন। ইএমএফ-এর প্রধান আবেদ আলী বলেন, ‘ তারা (বিদেশি) নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক। সাংবাদিকরা সবচেয়ে বড় নির্বাচন পর্যবেক্ষক।’ তার কথা, ‘যারা আমাকে পছন্দ করেন না, তারা আমার প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করেন।’ এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ সালেও নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য কয়েকজন বিদেশিকে নিয়ে এসেছিল। তারা তখন বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রশংসা করেন।
২০১৭ সালের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালায় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হওয়ার জন্য কোনো ব্যক্তির আট ধরনের যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে বয়স, অরাজনৈতিক, কোনো প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করার সঙ্গে শিক্ষাগত যোগ্যতা সর্বনিমন এসএসসি পাসের কথা বলা হয়েছে। তবে এই পর্যবেক্ষকদের নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত কোনো পর্যবেক্ষণ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। যেসব সংস্থা বা সংগঠন থেকে প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়, নির্বাচনের আগে এই সংস্থাগুলোকে কমিশন আবেদনের ভিত্তিতে নিবন্ধন দেয়। এবার নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হতে ১৯৯টি সংস্থা আবেদন করেছে। আগে থেকেই কমিশনে ১১৮টি সংস্থা নিবন্ধিত ছিল। তাদের মেয়াদ গত ১১ জুলাই শেষ হয়েছে। যারা আবেদন করেছে, তাদের মধ্যে ৪০টির নিবন্ধন ১১ জুলাই পর্যন্ত ছিল। বাকিগুলো নতুন। ২০১৮ সালের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো পর্যবেক্ষক টিম না এলেও দেশি ৮১টি পর্যবেক্ষক সংস্থার ২৫ হাজার ৯০০ জন এবং ওআইসি ও কমনওয়েলথ থেকে আমন্ত্রিত ও অন্যান্য বিদেশি পর্যবেক্ষক ৩৮ জন, কূটনৈতিক বা বিদেশি মিশনের কর্মকর্তা ৬৪ জন এবং বাংলাদেশে দূতাবাস বা হাইকমিশন বা বিদেশি সংস্থায় কর্মরত বাংলাদেশি ৬১ জন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। ওই সময় নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী আলোচিত দুটি সংস্থা ‘সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন’ এবং ‘ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম’-এর কাজ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ‘সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন’ আসলে সার্কের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এটির নামের সঙ্গে সার্ক জুড়ে দেয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়েছে, আমরা সব সময়ই চাই যেন বেশি সংখ্যায় দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। যত বেশি পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন নির্বাচনের বিষয়টি ততই সুষ্ঠু হবেÑএমনটাই ভাবা হয়। নির্বাচন কমিশনের জন্য দুইটি আলাদা নীতিমালা আছে। তারা সেটা অনুসরণ করে। কিন্তু যারা পর্যবেক্ষণের কাজ করেন, তারা তাদের ব্যাপারে যে তথ্য দেন তা নির্বাচন কমিশন সত্য ধরে নেয়। কারণ, ওই তথ্য যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশনের নেই। আর বিদেশি পর্যবেক্ষকদের বিষয়টি আসলে দেখে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নির্বাচন কমিশন শুধু অনুমোদন দেয়। কিন্তু তারা ক্লিয়ারেন্স না দিলে বিদেশিরা ভিসা পান না। প্রশ্ন হলোÑ নির্বাচন কমিশনের যদি তথ্য যাচাইয়ের কোনো পদ্ধতি না থাকে তাহলে যে যেমন তথ্য দিল সেটাই বিবেচনায় নিতে হবে। তাহলে পর্যবেক্ষকের তথ্য সুষ্ঠু এটা জনগণ কী করে বুঝবে? সেটা মনে হয় পরিষ্কার করা উচিত। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়সহ আরো যে চার বিদেশি প্রাক নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এসেছেন, এটা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নয়। তাই আমাদের অনুমোদনেরও প্রয়োজন হয়নি। তাদের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখেছে। তারা এখানে এসে আমাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে কথা বলেছেন। তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করার সুযোগ আমাদের নেই।
এ ব্যাপারে সাবেক নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেছেন ‘‘নির্বাচনের সময় যারা পর্যবেক্ষণ করবেন, তাদের অনুমোদন দেয় নির্বাচন কমিশন। আর আমরা বিদেশিদের অনুমতি দিলেও যে তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসতে পারবেন, তা কিন্তু নয়। আমাদের সময়ে আমরা অনেক বিদেশি পর্যবেক্ষণ সংস্থাকে অনুমোদন দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা সবাই আসতে পারেননি। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্লিয়ারেন্স না দেয়ায় তারা ভিসা পাননি। আবার আবেদ আলী সাহেব যাদের নিয়ে আসতে চেয়েছেন, তারা আসতে পেরেছেন। নীতিমালা অনুযায়ী বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কোনো সংগঠন আনতে পারে, রাষ্ট্রও আনতে পারে। সাধারণভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও ব্যক্তি আছে। তাদের নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু যে কাউকে বিশেষজ্ঞ বানিয়ে আনলে তো প্রশ্ন উঠবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ২০২০ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশের দূতাবাসগুলো ইসির কাছে থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষকের কার্ড নেয়। তখন ১০টি দেশের মিশনের মোট ৭৪ জন পর্যবেক্ষক কার্ড পান। তবে এর মধ্যে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি করা ২৮ জন বাংলাদেশি ছিলেন। বাকি ৪৬ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক। বাংলাদেশি ২৮ জনকে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। নির্বাচন কমিশনে পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত হতে হলে তাদের সুশাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে ভোটাধিকার ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে প্রচারের কাজের কথা। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ ব্যাপারে বলেন, “নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হতে হলে তাকে উচ্চ শিক্ষিত হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এসএসসি পাস হলেই হয়, যদি কাজটি তারা পারেন। কিন্তু যারা পর্যবেক্ষণ সংস্থা পরিচালনা করবেন, তাদের তো অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা থাকতে হবে।” তার কথা হলো “আবেদ আলী সাহেব যে চারজন বিদেশিকে নিয়ে এসেছেন, তাদের তো কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ২০১৮ সালেও তিনি বিদেশিদের এনে জালিয়াতি করেছেন, এখনো একই কাজ করছেন। নির্বাচন কশিমনের নীতিমালা যদি এই জালিয়াতির সুযোগ করে দেয়, তাহলে তা বদলানো উচিত।” তবে আবেদ আলী বলেন, তাদের আমন্ত্রণে যারা প্রাক নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এসেছিলেন তারা হলেন যুক্তরাষ্ট্রের টেরি ইসলে, আয়ারল্যান্ডের নিক পল, চীনের এন্ডি লিন ও জাপানের ইউসুকি সুগো। তারা সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সমাজ সেবক এবং রাজনৈতি বিশ্লেষক বলেও দাবি তার। তাদের মধ্যে একজন সাংবাদিক। তিনি জানান, সামনের নির্বাচনে আমাদের বড় পর্যবেক্ষক দল থাকবে। সেখানেও বিদেশি পর্যবেক্ষকরা থাকবেন। কিন্তু আমরা মনেকরি সুশীল সমাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বা সাংবাদিকতার পরিচয় মুখ্য নয়। আসল পরিচয় হলো নির্বাচন কাজে তার অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা। এসব না থাকলে এবং নির্বাচন কমিশনের তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা না থাকলে পর্যবেক্ষক থাকলেও কি আসল তথ্য পাওয়া যাবে? এ বিষয়টি সম্বন্ধে যথাযথ অভিজ্ঞান না থাকলে পর্যবেক্ষক নিয়োগের মাপকাঠি কী হবে? তাছাড়া যেমন তেমন অজস্র পর্যবেক্ষক নিয়োগের পর ফলাফল যদি হিতে বিপরীত হয় তখন কি হবে, এটা ভেবে কাজ করা উচিত।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট