• ঢাকা
  • শুক্রবার:২০২৪:এপ্রিল || ১৩:৫৯:২৪
প্রকাশের সময় :
জুন ১৬, ২০২৩,
২:২৯ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট :
জুন ১৬, ২০২৩,
২:২৯ অপরাহ্ন

৬৩৮ বার দেখা হয়েছে ।

নব্য ধনিকদের অর্থের খোঁজ নিন

নব্য ধনিকদের অর্থের খোঁজ নিন

কথায় বলে ‘কারও পৌষ মাস আর কারও সর্বনাশ।’ পৃথিবীর অধিকাংশ দুর্যোগেই দেখা যায়, কোটি মানুষের সর্বনাশ হয়। আবার কিছু মানুষ দুর্যোগের মধ্যে থেকেও লাভবান হন এমন ঘটনারও আমাদের সমাজেই দেখা মেলে। মহামারি, দুর্বিপাকে যেখানে মানুষের জীবন বাঁচানো কঠিন। সেখানে মানুষের সংকটকে পুঁজি করে কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার মতো ঘটনা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে একটি খবর। করোনার বছরেও বাংলাদেশে কোটিপতি বেড়েছে ১১ হাজার ৬৪৭ জন। করোনা মহামারিতে যেখানে জীবন বাঁচানো দায়, মানুষ অসহায়- তখন মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে নিজের সম্পদ বাড়ানোর কাজ যারা করেছে তারা আমাদের আশপাশের মানুষ-ভাবতে অবাক হতে হয়। বর্তমানে দেশে ডলার সংকট প্রকট। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সংসার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিু আয়ের মানুষ। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। জীবন যেন চলছেই না। সাধারণ খেটে খাওয়ার মানুষের বেঁচে থাকাটা যেন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে কিছু মানুষের সম্পদ বেড়েছে, হয়েছেন কোটিপতি। দেশের অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও ব্যাংকিং খাতে গত ৩ মাসে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ২৪৫ জন। এত তাড়াতাড়ি দেশে নব্য ধনীর সংখ্যা বাড়ল কী করে? এই নব্য ধনীরা সবাই কোটিপতি। গত বছরের মার্চ থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ৬ হাজার ৫৯৫। কোথা থেকে আসে এত টাকা। এই টাকার উৎস কোথায়?
বছর আসে, বছর যায়। অর্থনীতির উন্নতি হয়। কিন্তু লাভ হয় কেবল বড়লোকদেরই। নিু আয়ের মানুষের জীবনে কোনো উন্নতি নেই। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় সাড়ে চারশ’ বছর আগে এথেন্সে বসে দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, ‘শহরের আকার যত ছোটই হোক না কেন, তা মূলত দুভাগে বিভক্ত। ধনী আর গরিব। নিু আয়ের মানুষ এবং কোটিপতিÑ এই বৈষম্য দিন দিন বাড়ছেই। এই দুপক্ষের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ চলবেই।’ অনেকেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে এবং দুর্নীতি করে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে। পৃথিবীতে যে পরিমাণ ধনীর ধনভাণ্ডার বৃদ্ধি পাচ্ছে, এই পরিমাণ ধনভাণ্ডার যদি নিু আয়ের মানুষ দূর করার কাজে ব্যবহার হতো তাহলে বিশ্বে আর ধনী-গরিব ভেদাভেদ থাকত না। দুর্নীতিবাজ, ঘুষ খোর, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, অবৈধভাবে টাকা পাচারকারী, সামাজিক ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে বড় লোকের সংখ্যা। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও। নব্য বড় লোকেরা অসহায় দরিদ্রদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। এর বেশিরভাগই শিকার হচ্ছেন নিু মধ্যবিত্তরা। যারা না পারেন রিকশা চালাতে, না পারেন মাছ বিক্রি করতে।
দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে। মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে দেশ। শহরে সুউচ্চ ভবন বাড়ছে। বাড়ছে নিু মধ্যবিত্ত আয়ের বৈষম্য। বাজার থেকে শুরু করে সব জায়গায় সিন্ডিকেটের রাজত্ব। এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ নেয়া যায়নি আজও। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করে তুলছে। ব্রিটিশ আমলের অবিভক্ত বাংলাদেশে পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষে মানুষ মারা গিয়েছিল ৫০ লাখ। তখন কোটিপতি নয়, লাখপতিই ছিল বড়লোক হওয়ার মাপকাঠি। পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষে যে ৫০ লাখ লোক মারা গেছে, তাদের মাথাপিছু প্রতিটি মৃত্যুতে অসাধু খাদ্য ব্যবসায়ীরা লাভ করেছেন এক হাজার টাকা করে। এটা তো প্রায় একশ বছর আগের কথা। বর্তমানে দুর্ভিক্ষে অনুরূপ মৃত্যু ঘটলে অসাধু খাদ্য ব্যবসায়ীরা মাথাপিছু মৃত্যুতে হাজার টাকা নয়, লক্ষাধিক টাকা লাভ করতেন। তারা লাখপতি নয়, কোটিপতি হতেন। বাংলাদেশে করোনার বছরে যা হয়েছে। সেটা ভাবলে অবাক হতে হয়। চারদিকে মানুষ নেই। ভয়ে মানুষ ঘর থেকে বের হয় না। খাদ্য সংকট প্রকট আকার নিয়েছে। সরকার থেকে সংগঠন, ব্যক্তি সবাই মানুষের সংকটে পাশে দাঁড়াতে ব্যস্ত। এর মধ্যে যারা বড়লোক হওয়ার তারা হয়েছে।
দেশে ধনী ব্যক্তিদের সংখ্যা বেড়েই চলছে। মহামারি করোনাভাইরাসের মধ্যেও এ সংখ্যা কমেনি। এ সময়ে বিনিয়োগ ও শেয়ারজাবার স্থবির থাকলেও অনেকে ব্যাংক টাকা রাখতে পছন্দ করছেন। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগিত, চিকিৎসা সামগ্রী, টেলিমেডিসিন সেবা, ইন্টারন্টে ও আইটি ব্যবসা ভালো হওয়ার কারণে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। দেশে কোটিপতি সংখ্যা বৃদ্ধির হার ইঙ্গিত দেয় যে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, আর গরিবরা আরও গরিব। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ও সামাজিক ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।
করোনাকালে মানুষ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বেশি ব্যবহার করেছে। ফলে দেশের ই-কমার্সের ব্যবসা, ইন্টানেটের ব্যবসায় ভালো চলেছে। এটিই ই-বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের উন্নতি দেশে ই-কমার্সকেও উৎসাহিত করেছে। অনলাইনে পোশাক, ওষুধ, চিকিৎসা সামগ্রী, নিত্যপণ্য, ইলেকট্রনিক পণ্য, আইটি পণ্য বেশি বিক্রি হয়েছে। এ সঙ্গে সশ্লিষ্ট ব্যসায়ীদের ব্যবসা লাভবান হওয়ায় অনেকেই কোটি কোটির কাতারে দাঁড়িয়েছেন। আবার কেউ কেউ ভুয়া হাসপাতাল তৈরি করে, করোনা শনাক্তকরণের নামে ভুয়া সার্টিফিকেট বিক্রি করে এবং নানা দুর্নীতি করে অনেকে নব্য ধনী বনে গেছেন।
করোনার জন্য সরকার যেসব বড় ছাড় দিয়েছে, সেই কারণে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী অত্যন্ত লাভবান হয়েছেন। এছাড়া করোনার ক্ষতি পোষানোর জন্য সরকারের দেওয়া প্রণোদনা ঋণ অনেক সুবিধাভোগী ব্যবসায় না খাটিয়ে ব্যাংকে জমা রেখেছেন ভবিষ্যতের আরাম-আয়েশের জন্য। কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে দেশে ইনকাম ডিসপ্যারিটি বা আয়বৈষম্য দারুণভাবে বেড়েছে। করোনায় অনেকের বেতন কমে গেছে। অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। ছোট উদ্যোক্তারা ঋণ চেয়েও পাননি। করোনার জন্য সরকার যেসব ছাড় বা প্রণোদনার অর্থ দিয়েছে, তা দিয়ে তেলা মাথায় তেল দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ছোট উদ্যোক্তাদের চাইতে বড় এবং ধনী ব্যবসায়ীরা ছাড় এবং প্রণোদনার অর্থ দুটোই বেশি পেয়েছেন এবং তাদের অনেকে আবার সেই অর্থ ব্যাংকে রেখে নব্য কোটিপতি হয়েছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে কোটিপতি আমানতকারী ছিলেন ১ লাখ ৯ হাজার ৯৪৭ জন। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ১৯২ জনে। আলোচ্য সময়ে ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধির হার কমলেও কোটপতি আমানতকারীদের সংখ্যা বেড়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনটি প্রতি তিন মাস পরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশ করে থাকে। ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারী বাড়ার ফলে একটি বিশেষ শ্রেণি ধীরে ধীরে ধনী হয়ে যাচ্ছে। এতে সমাজে ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়ছে। অনেকেই হুন্ডির ব্যবসা করে, নানা দুর্নীতি করে, সিন্ডিকেট করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে এবং অন্যান্য নানা উপায়ে কোটিপতি হয়েছেন। প্রশ্নটা হচ্ছে এই অর্থের উৎস কী? বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত এই অর্থের সন্ধান খতিয়ে দেখা। দেশে ধনী-গরিবের বৈষম্য বর্তমানে এত বেড়েছে যে, এই অর্থের মধ্যে রয়েছে গরিবের রক্ত নিংড়ানো অর্থও। এসব খোঁজ-খবর না রাখলে নিত্য-নতুন ধনিক শ্রেণির উদ্ভব হবে। আর ধনী হতে হলে কাউকে গরিব বানাতেই হয়। অর্থনীতির এই হিসাব টপকে কোনো কিছু দেখা যাবে না। দেশে এত দ্রুত ধনী হওয়ার পথ যদি বন্ধ না হয় তাহলে গরিব বাড়বে একই হারে, বাড়বে ধনী-গরিব বৈষম্য। সমাজে শ্রেণি থাকলে শ্রেণি বৈষম্য থাকবে, জোরদার হবে শ্রেণি সংগ্রাম। এই পরিস্থিতি হওয়ার আগে নব্য ধনিকদের অর্থের খোঁজ নেয়া জরুরি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট