• ঢাকা
  • শুক্রবার:২০২৪:এপ্রিল || ১৪:০৮:১১
প্রকাশের সময় :
জুন ২১, ২০২৩,
১:৫২ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট :
জুন ২১, ২০২৩,
১:৫২ অপরাহ্ন

৬৩২ বার দেখা হয়েছে ।

গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা কোথায়

গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা কোথায়

গণমাধ্যম সময়ের প্রতিচ্ছবি। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর চিত্র ধারণ করে ইতিহাসের বুকে সময়ের চিত্র এঁকে চলে গণমাধ্যম। গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ একথা অনেক পুরানো। তারপরও একথার বিকল্প নেই। গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম শব্দ দুটির মধ্যে ‘গণ’ বা জনগণের অংশগ্রহণ নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। অথচ গণমাধ্যমের অতন্ত্র প্রহরী সাংবাদিকরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মহলের দ্বারা অত্যাচারিত-নির্যাতিত হয়ে আসছে। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাসহ সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা প্রায় প্রাত্যহিক। প্রতিনিয়ত ঘটছে যেসব ঘটনা, তা বলে শেষ করা যাবে না।
এদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, অসৎ রাজনীতিবিদ, মাদক ব্যবসায়ী থেকে গডফাদারদের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে সন্ত্রাসীরা হামলা চালায় সাংবাদিকদের ওপর। আর যাতে মদদ জোগায় অসৎ শ্রেণি, যারা অবৈধ উপায়ে বিত্ত বৈভবের মালিক হয়েছেন। এদেশে টিপুসহ অনেক সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছে। পুলিশের হাতে আহত হয়েছে অনেক নামকরা সাংবাদিক। বিচার কি একটিরও হয়েছে? জবাবদিহিতা ও দৃষ্টামূলক শাস্তির অভাবে একর পর এক নৃশংস ঘটনা ঘটছে সাংবাদিকদের ওপর। সার্বিকভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়, সাংবাদিক শব্দটার মধ্যে লুকিয়ে আছে এক ধরনের শ্রদ্ধা। সাংবাদিকতার এই মহান পেশাটাকে যারা ব্রত মনে করে নির্ভীকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তারা পড়ছেন বিপদে। বিশেষত বিপজ্জনক ঘটনা ঘটছে দেশের উন্নয়নের বিভিন্ন প্রকল্প যখন গ্রামে যাচ্ছে। পুঁজির অসম বিকাশ গ্রাম পর্যায়ে এমন এক পরিস্থিতির জš§ দিয়েছে যেখানে কারো অনিয়মের বিরুদ্ধে কিছু বলার অবস্থা নেই। যারা বলবে তাদের বাড়িঘর সব চেনা। তাদের মেরে ফেলা হবে। এভাবে গণমাধ্যমে গত ১৫ মাসে ৪ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। সম্প্রতি জামালপুরে সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে, তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান। বিস্মিত হতে হয় এই ভেবে যে, একজন ইউপি চেয়ারম্যানের সাহস হয় কি করে সাংবাদিক হত্যা করার। তার খুঁটির জোর কোথায়?
একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ হয়েছে, গ্রামের মুদি দোকানি থেকে কিভাবে কোটিপতি বনে গেলেন, হলেন সাধুরপাড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক। তবে এলাকাবাসীর বক্তব্য দ্বিতীয়বার চেয়ারম্যান হওয়ার পরই চেয়ারম্যান ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। ক্যাডার ও মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে তিনি চলতেন। পুলিশ কর্মকর্তার ভাই হওয়ায় থানার অনেকে বাবুকে সমীহ করতেন। তদবির ও নিয়োগ বাণিজ্য, থানায় দালালি ও বিচার সালিশের নামে ইউপি চেয়ারম্যান বাবু দুই হাতে টাকা কামিয়েছেন। তার অপকর্মের কথা লেখাতেই মরতে হয় গোলাম রাব্বানী নাদিমকে। সাংবাদিকরা কি সমাজের ভালো-মন্দর কথা লিখতে পারবে না। তাহলে আজ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোথায়?
গণতন্ত্রের সঙ্গে গণমাধ্যমের এক ধরনের সমান্তরাল সম্পর্ক। অর্থাৎ গণতন্ত্রের জন্য যেমন গণমাধ্যম দরকার, তেমনি গণমাধ্যমের আক্ষরিক অর্থে গণমাধ্যম হয়ে ওঠার জন্য দরকার গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা। গণমাধ্যমকে একটি রাষ্ট্রের দর্পণ বা আয়না স্বরূপ বিবেচনা করা হয়। তাই একটি রাষ্ট্রের উন্নতি, অগ্রগতি ও রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণে গণমাধ্যমের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। গণমাধ্যম সরকার এবং জনগণের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।
যেকোনো রাষ্ট্রে গণমাধ্যম হবে গণমানুষের সারথিস্বরূপ। অসহায় মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, যন্ত্রণা, হতাশা, দুর্দশা, অধিকার, অসাম্য প্রভৃতি বিষয় তুলে ধরে সমাধানের পথ ত্বরান্বিত করবে গণমাধ্যম।
নিজের স্বার্থের মুনাফা লোটার কথা লিখলেই সাংবাদিকদের ওপরে অত্যাচার, অবিচার নেমে আসবে। প্রকাশ্য দিনের আলোতে খুন হতে হবে সাংবাদিককে। এখানেই শেষ নয়, সত্য কথা লেখা বা বলার জন্য একাধিক সাংবাদিককে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জেল খাটানো হচ্ছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাংবাদিকতার গুরুত্ব এবং এই পেশার সম্মান অক্ষুণœ রাখা জরুরি। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে একজন সাংবাদিকের পেশাগত সংগ্রাম ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি রয়েছে। সেই মহান কাজের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকদের আঘাত করার কোনো অধিকার কারও নেই।
সমাজের সব অসঙ্গতি, ভুল-ভ্রান্তি প্রচার মাধ্যমে তুলে ধরে কর্তৃপক্ষের ‘চোখে আঙ্গুল দিয়ে’ দেখিয়ে দেয়ার দায়িত্ব সাংবাদিককের। সত্যের সন্ধানে সে থাকবে নির্ভীক। সবসময় সে নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, অসহায়, অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়াবে। কথাগুলো শুনতে ভালোই লাগে। কিন্তু একজন সংবাদকর্মীর এটিই হওয়া উচিত।
সাংবাদিক শব্দের মর্যাদা অপরিসীম। আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, সাংবাদিকের কাজ কী? কোন পথে সে চলবে? এমন প্রশ্ন করা হলে সবার জবাব হবে- সাংবাদিক হচ্ছে সমাজরক্ষক। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অসংখ্য সাংবাদিক খুনের শিকার হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির নেই। মানিক সাহা, হারুন অর রশিদসহ তিন সাংবাদিক হত্যার বিচার পেতেও অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে স্বজনদের। দেশের আলোচিত সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি ১১ বছরেও। কেন সাংবাদিক হত্যার বিচার হয় না তা সরকারই ভালো জানে। বিচারহীনতার কারণে দেশে একের পর এক সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনা বাড়ছে।
গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে ৩৫ সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১২ শতাধিক সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী। কিন্তু ন্যায়বিচার পেয়েছেন কয়জন। বিচারহীনতা এবং বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। তবে স্বাধীনতার পর দেশে কত সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান আছে কি? মানুষকে সোচ্চার হওয়ার মধ্য দিয়ে সংশোধনের পথ বাতলে একটি সুন্দর, নৈতিক ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলাই গণমাধ্যমের অন্যতম লক্ষ্য। একমাত্র স্বাধীন গণমাধ্যমই বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাই এ লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে গণমানুষের অধিকারের সম্পর্ক খুঁজতে গেলে তাকাতে হবে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের দিকে। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এ ঘোষণা প্রদান করা হয়। এ ঘোষণাপত্রের ১৯তম ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক মানুষেরই মতামত পোষণ ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। অবাধে মতামত পোষণ এবং রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্বিশেষে যেকোনো মাধ্যমে ভাব ও তথ্য জ্ঞাপন, গ্রহণ ও সন্ধানের স্বাধীনতাও এ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।’
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে, তার ভিত্তিতে ২০০২ সাল থেকে আরএসএফ এই সূচক প্রকাশ করে আসছে। এসব ঘটনা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরে। সূচকে বাংলাদেশের ভয়ঙ্কর পিছিয়ে পড়ার মূলে রয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এই আইনের ব্যবহার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাছাড়া মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য সরকারকে যে দায়িত্ব পালন করতে হয় বিগত ৫২ বছরে আমাদের দেশের কোনো সরকার সেই দায়িত্ব তেমনভাবে পালন করেনি। ফলে মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবনতি ঘটছে।
আমরা আশা করি, সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রসারে প্রয়োজন সাংবাদিকদের সাহসী কলম। সাংবাদিকের কলমেই প্রকাশ করে দুর্নীতির গোপন তথ্য। কবে আমরা সেইদিন পাব যেদিন এদেশের কোনো সাংবাদিক আর নির্যাতনের শিকার হবে না? গণমাধ্যমগুলো সংবাদ ও সাংবাদিকতার সকল নিয়মনীতি মেনে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রের সঠিক ও সত্য চিত্র তুলে ধরে গণমাধ্যমের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণে সফল হবে এবং তাদের সে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট