• ঢাকা
  • শুক্রবার:২০২৪:মে || ০৩:৫৯:৩৯
প্রকাশের সময় :
মার্চ ১৪, ২০২৩,
৪:১১ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট :
মার্চ ১৪, ২০২৩,
৪:১১ অপরাহ্ন

৩৯০ বার দেখা হয়েছে ।

উত্তর জনপদের গণহত্যা

উত্তর জনপদের গণহত্যা

বাংলাদেশের গণহত্যা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা ইতিহাসের বর্বরতম একটি অধ্যায়। নয় মাসের এ যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ আÍদান করেছে। হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণসহ ব্যাপক নৃশংসতা চালিয়েছে পাকিস্তানিরা। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল এবং লাখ লাখ মানুষকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল। ভারত সরকার, যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল, সংঘর্ষে হস্তক্ষেপ করেছিল এবং ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আÍসমর্পণ করলে এই সংঘাতের অবসান ঘটে, যার ফলে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হয়। কিন্তু গণহত্যার সময় নিহত মানুষের সঠিক সংখ্যা আজও অজানা। বাংলাদেশ গণহত্যাকে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্যতম নৃশংসতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংঘাতের উত্তরাধিকার বাংলাদেশে অনুভূত হচ্ছে। অথচ আজও চিহ্নিত হয়নি গণহত্যার এলাকা। তালিকা হয়নি শহীদদের। যাদের রক্তে আমরা স্বাধীন। এই গণহত্যার জন্য পাকিস্তানে সরকার এখনও ক্ষমা চায়নি।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যাকাণ্ড চালায়। এর মধ্য দিয়ে বর্বর পাকিস্তান বাহিনী শুরু করে গণহত্যা। সারাদেশে তারা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে দেয় গণহত্যার বীজ। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজার বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া ে গেছে। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের গণহত্যার একটি করুণ চিত্র এখানে তুলে ধরা হলো।
রংপুরের গণহত্যা: শহরে ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ২৩তম ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার। ২৩ মার্চ পাকিস্তানি সেনা অফিসার অবাঙালি লে. আব্বাসের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রংপুর এলাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ফলে ২৮ মার্চ হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষ তির-ধনুক-বল্লম-লাঠি-দা-কুড়াল এবং বাঁশের লাঠি হাতে রংপুর সেনানিবাস আক্রমণের উদ্দেশ্যে ঘাঘট নদের তীর ঘেঁষে জমায়েত হতে থাকে। এ সময় ক্যান্টনমেন্ট থেকে ছুটে আসতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনীর আগ্নেয়াস্ত্রের ঝাঁক ঝাঁক গুলি। পাখির মতো লুটিয়ে পড়ে মানুষ। ঘাঘট নদের পানি হাজারো শহীদের রক্তে লাল হয়ে যায়। এতে এই ঘাঘট নদের তীর একটি বৃহৎ বধ্যভূমিতে পরিণত হয়।
নাবিরহাট বধ্যভূমি: জাফরগঞ্জ পুল বধ্যভূমি, নিশবেতগঞ্জ বধ্যভূমি ,বৈরাগীগঞ্জ বধ্যভূমি, দমদমা সেতু বধ্যভূমি, বলদিপুকুর বধ্যভূমি, মহিগঞ্জ শ্মশানঘাট বধ্যভূমি , মডার্ন সিনেমা হল বধ্যভূমি, সাহেবগঞ্জ বধ্যভূমি, বধ্যভূমি দেবীপুর বধ্যভূমি,কুকুরুন বিল বধ্যভূমি, শিবগঞ্জ বধ্যভূমি, টাউন হল বধ্যভূমি ছাড়াও রংপুরের বিভিন্ন বধ্যভূমিতে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়।
লালমনিরহাটের গণহত্যা: কালীগঞ্জ বধ্যভূমি, বিডিআর লাইন, রেলস্টেশন রিকশাস্ট্যান্ড বধ্যভূমি ডিভিশনাল অফিস জলাভূমি বধ্যভূমির গণহত্যা হয়ে ছিলো লালমনির হাট এলাকায়। হানাদার-বাহিনীর অনুপ্রবেশের পর অবাঙালি অধ্যুষিত লালমনিরহাট সদরে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের বর্বরতম হত্যা, ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ। এহেন বর্বরতা পরবর্তী সময়ে বিস্তৃত হয়েছিল অন্যান্য উপজেলায় (তখনকার থানা)। সেসময় পুরো জেলাকে তারা বধ্যভূমিতে পরিণত করেছিল। একই সময় এ জেলার বিস্তীর্ণ ভূমি পরিণত হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রে। ৭১ এর ৮ মাস ১ দিনব্যাপী ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল মোগলহাট-হাতীবান্ধাসহ বিভিন্ন রণাঙ্গনে। এই জেলার গণহত্যার ভয়াবহতা, ধ্বংসযজ্ঞ ও মুক্তিযুদ্ধের বিবিধ বীরত্বপূর্ণ অনুষঙ্গকে উপজীব্য করে লিখা হয়েছে এই গ্রন্থটি। তুলে ধরা হয়েছে মহান শহিদ, বধ্যভূমি, গণকবরের পরিচিতি-অবস্থান এবং বীর যোদ্ধাদের বীরত্বগাথাসহ এলাকার ছয়দফা, ৭০ এর নির্বাচন ও যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির নানাবিধ গৌরবময় অধ্যায়। আশা করি তথ্য-উপাত্ত সমৃদ্ধ এ গ্রন্থটি সদাশয় পাঠককুল কর্তৃক সমাদৃত হবে।
গাইবান্ধার গণহত্যা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রির পর থেকে পাকিস্তানিরা বাংলার প্রতিটি জনপদকে এক একটি গণকবরে রূপান্তরিত করতে থাকে। উত্তরবঙ্গের জনপদ গাইবান্ধা তার চেয়ে ভিন্ন ছিল না। গাইবান্ধার বধ্যভূমি হেলাল পার্কের নাম শুনলে এখনো আঁতকে ওঠে গাইবান্ধার মানুষ। হেলাল পার্কের এই বধ্যভূমিতে কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তার সঠিক হিসাব কেউ বলতে পারেন না। ১৯৭১ সালের ১১ জুন কাশিয়াবাড়ির মানুষ পাকিস্তানি হানাদার ও অবাঙালিদের তাড়া খেয়ে পালাতে থাকে। কিন্তু কাশিয়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের সেক্রেটারি হারেস মিয়া পালাতে পারেননি। তাকে পাকিস্তানি সেনারা জবাই করে হত্যা করে। এ ছাড়া ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলজার মিয়াসহ আরও অনেককেই জবাই করে হত্যা করা হয়। ধর্ষণ করা হয় ফুলবানু, গিরিবালাসহ বহু নারীকে। আগুন লাগিয়ে গ্রামটিকে মিশিয়ে দেয় নরপশুরা। যারা পালাতে পারেনি, তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। নরপশুরা প্রায় ৭০০ লোককে ধরে এনে কাশিয়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।
বোনারপাড়া জংশনে গণহত্যা: পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী গাইবান্ধার ভরতখালীতে রেললাইনের মধ্যবর্তী স্থানে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে পুঁতে রাখে। বগুড়ার সারিয়াকান্দি থানা থেকে লোক ধরে এনে এখানে হত্যা করা হয়েছে। নলডাঙ্গার আওয়ামী লীগ নেতা একরাম উদ্দিন, রংপুরের বিশিষ্ট আইনজীবী বিজয় চন্দ্র মৈত্র, তার দুই ছেলে এবং গফুর নামে অপর এক ব্যক্তিকেও হত্যা করে এখানে পুঁতে রাখা হয়। মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনী ও অবাঙালিরা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্বাধীনতার মহান মন্ত্রে উজ্জীবিত হাজারখানেক বাঙালিকে ধরে এনে চরম নির্যাতনের পর সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে এই ফুলছড়ি বধ্যভূমিতে। স্বাধীনতার পর স্থানীয় জনগণের উদ্যোগে বধ্যভূমিটি প্রাচীরবেষ্টিত করে পাশে একটি শহীদ মিনার নির্মিত হয়।
পঞ্চগড়ের গণহত্যা: পঞ্চগড়ের গণহত্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- আটোয়ারি গণহত্যা, আলোয়াখোয়া গণহত্যা,বোদা গণহত্যা, অমরখানা গণহত্যা, মির্জাপুর ও অন্যান্য গ্রাম গণহত্যা, মীরগড় গণহত্যা ইত্যাদি।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যাকাণ্ড চালায়। এটা বিশ্বের নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড। জাতিসংঘের গণহত্যা সংজ্ঞায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে প্রথম চারটিই সংঘটিত হলেও এখন আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি মেলেনি। বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যায় ৩০ লাখ মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসর শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সহযোগিতায় এ হত্যাকাণ্ড চলে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজার বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া যায়। চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে এক হাজারের ওপর। বধ্যভূমি থেকে অসংখ্য মাথার খুলি, শরীরের হাড়গোড়, চুল পাওয়া গেছে।