• ঢাকা
  • শুক্রবার:২০২৪:মে || ০৫:১৪:১০
প্রকাশের সময় :
মে ৪, ২০২৩,
৪:৪৫ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট :
মে ৪, ২০২৩,
৪:৪৫ অপরাহ্ন

৪১৪ বার দেখা হয়েছে ।

ইটভাটার কারণে দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে কৃষি জমি

ইটভাটার কারণে দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে কৃষি জমি

দেশের মোট জনসংখ্যা এখন ১৮ কোটির ওপরে। দেশের প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১১০৬ জন লোক বাস করে। এই বিপুল সংখ্যক জনগণের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাসস্থান আর বাসস্থানের জন্য প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে শত শত হেক্টর কৃষি জমি। উজাড় করা হচ্ছে বন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২২৫ হেক্টর এবং বছরে ৮২০০০ হেক্টর ভূমি নষ্ট হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে আবাসন তৈরি ও ইটভাটার জন্য মাটি সংগ্রহ করা। বর্তমান আধুনিক বিশ্বে এই বিশাল বহুতল ভবন নির্মাণে কংক্রিট, অ্যালুমিনিয়াম সিট, প্লাস্টিক, কাচ ফাইবার, স্টিল এবং ধাতব বস্তুর ব্যাপক ব্যবহার হলেও বাংলাদেশসহ বহু স্বল্পোন্নত দেশে প্রধানত ব্যবহার হচ্ছে ইট। আর এই ইট তৈরিতে ব্যবহার হয় প্রকৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তম উপাদান মাটি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যা নেওয়া হয় কৃষি জমি থেকে।
বাংলাদেশে সাধারণত বছরের অক্টোবর থেকে মার্চ মাসকে ইট তৈরির উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেন ইট কারখানার মালিকেরা। ইট তৈরিতে পোড়ানো হয় শত শত একর জমির উর্বর অংশ। ইটভাটার মালিকেরা কৃষকদের লোভ দেখিয়ে এককালীন অল্প কিছু টাকা দিয়ে চাষাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জমির উপরি অংশের মাটি কেটে নিয়ে যায় ইট তৈরির জন্য। আজকের এই আধুনিক বিশ্বে ইটের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু নিয়ম না মেনে এই প্রয়োজনীয় বস্তু তৈরিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ, মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, উর্বর মাটি ও বায়ু।
ইট ইমারত তৈরির একটি অত্যাবশকীয় ও মৌলিক উপাদান বিশেষ। প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রোদে শুকানো বা আগুনে পোড়ানো ইট ব্যবহার হয়ে আসছে। যদিও ইট পাথরের মতো দীর্ঘস্থায়ী এবং মজবুত নয়। তারপরও সহজলভ্যতা ও অল্প খরচের জন্য এর জনপ্রিয়তা এবং ব্যবহার সর্বাধিক।
ইটভাটা পরিবেশের জন্য কত ক্ষতিকর সে কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। বসবাসরত বাড়ির পাশে, স্কুলের পাশে, ফসলি জমির পাশে নির্দ্বিধায় স্থাপন করা হচ্ছে ইটভাটা। এই ইটভাটার কারণে বায়ুদূষণ ঘটছে মারাÍকভাবে। ইটভাটা স্থাপন করায় নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি। ধ্বংস হচ্ছে পাহাড় ও গাছপালা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এ পদ্ধতিতে ইট তৈরির কারণে মারাÍক ক্ষতি হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের। তারপরও বন্ধ হয়নি পরিবেশ বিধ্বংসী ইটভাটার কার্যক্রম। তাই এসব ইটভাটা বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালীরা পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করেও প্রকাশ্য দিবালোকে গড়ে তুলছে ইটভাটা। সারাদেশে ইটভাটাগুলো চলছে সেগুলোর মালিকদের খেয়ালখুশিমতো। অধিকাংশ ইটভাটার মালিক আইনকানুনের তোয়াক্কা করেন না। কারণ, তারা কীভাবে ইটভাটাগুলো চালাচ্ছেন, সেদিকে সরকারি কর্তৃপক্ষের কোনো নজর নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে মোট ইটভাটার সংখ্যা ৮ হাজার ৩৩টি। এগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৫১৩টির পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। আইন অনুযায়ী পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ইটভাটা চলতে পারে না, সে অর্থে এগুলো অবৈধ স্থাপনা। উপরন্তু, ইটভাটায় জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণের যে শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছে, ২ হাজার ৮৩৭টি ইটভাটা সেই প্রযুক্তি গ্রহণ করেনি। এই ইটভাটাগুলোও আইনত অবৈধ। পরিবেশ অধিদপ্তর সম্প্রতি ৩ হাজারের বেশি অবৈধ ইটভাটার একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক ইটভাটা কি রাতারাতি নির্মিত হয়েছে? পরিবেশ ছাড়পত্র না নিয়ে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণ না করে যেসব ইটভাটা ইট পোড়ানোর কাজ শুরু করেছে এবং ইট পুড়িয়ে চলেছে, পরিবেশ অধিদপ্তর কেন এত দিন সেগুলোর খোঁজ রাখেনি? শুধু তাই নয়, যেসব ইটভাটা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে বলে দাবি করেছে, তাদের প্রযুক্তিগুলো প্রকৃতপক্ষে কতটা পরিবেশবান্ধব, সে বিষয়েও পরিবেশ অধিদপ্তর খোঁজ রাখেনি।
ইটভাটায় জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার হয় আমদানিকৃত নিুমানের কয়লা। এ কয়লা পোড়ানোর ফলে প্রচুর পরিমাণ ছাই তৈরি হয়। অন্যদিকে ইটভাটা থেকে বায়ুমণ্ডলে নানা দূষিত উপাদানও যোগ হচ্ছে। এসব উপাদান মানবদেহে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করলে রেসপিরেটরি সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এ কারণে ইটভাটার আশপাশে বসবাসরত মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা যায় বেশি। এছাড়া ইটভাটা থেকে নির্গত ছাই পার্শ্ববর্তী নদী বা জলাশয়ে নিষ্কাশিত হয়। ওই বর্জ্য পানিতে মিশে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত উপাদান জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলের দ্বারা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। ফলে মানুষ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কৃষিজমির ওপরও ইটভাটার ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। জমির উর্বরতা শক্তি কমছে। কাজেই সব দিক বিবেচনা করে ইটের পরিবর্তে ব্লকের ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বস্তুত দেশের সব ইটভাটার কার্যক্রমই পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে ভবন নির্মাণে ইটের বিকল্প পরিবেশবান্ধব ব্লক ব্যবহার করা যেতে পারে। দেশে এ প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে ব্লক তৈরির বেশকিছু কারখানা গড়ে উঠেছে। তবে এ ব্যাপারে সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের সরকারি নির্মাণে ব্লক ব্যবহারের নির্দেশ রয়েছে। ব্লকের প্রসার ঘটলে কম খরচে মানসম্মত নির্মাণকাজ করা সম্ভব হবে।
ইট তৈরির শিল্পটিকে পরিবেশসম্মতভাবে পরিচালনা করার জন্য বাংলাদেশে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩ নামের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আইন আছে। তা ছাড়া ২০১০ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের স্বাভাবিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা হলে পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া দেশে একটিও ইটভাটা চালু করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, দেশের প্রতি তিনটি ইটভাটার মধ্যে একটিই চলছে অবৈধভাবে। এটা কাগজ-কলমের হিসাব। প্রকৃতপক্ষে দেশের ৯০ শতাংশ ইটভাটাই অবৈধ। বছরের পর বছর ধরে এগুলো মারাÍক দূষণ ঘটিয়ে চলেছে, কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। জনবসতির কাছে কেন টিকে থাকে ইটভাটা। নিঃশ্বাসে দূষণ কেন বাড়েÑ এসব কথার জবাব দেবে কে? এভাবে ক্ষতিকর ইটভাটা এককের পর এক টিকে থাকছে এলাকার মানুষের পরিবেশের সর্বনাশ করে।
আমাদের পরিবেশ রক্ষার জন্য আধুনিক পদ্ধতিতে ইট উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। ইট উৎপাদনে ক্রমাগত মাটির উপরিভাগের অংশের ব্যবহার বন্ধকরণ এবং কাঠ-কয়লার ব্যবহার কমিয়ে বনভূমি উজাড়করণ রোধ ও বায়ুদূষণ কমানোসহ পরিবেশ রক্ষায় সরকারি বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান ও জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।
উল্লেখ্য, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ (সংশোধিত) ২০১৮ অনুযায়ী আবাসিক, সংরক্ষিত ও বাণিজ্যিক এলাকা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর ও কৃষি জমিতে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এ আইন লঙ্ঘন করেই চলছে অবৈধ ইটভাটাগুলোর কার্যক্রম। এগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করতে সরকার ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজর দেবে কি?


লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট